নিজস্ব প্রতিবেদক : সিলেট মহানগর পুলিশ-এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম প্রযুক্তি নির্ভর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মহানগরীর আইন-শৃঙ্খলা ও যানজট পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সফল হওয়ায় নগরবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন।
এসএমপির মিডিয়া সেল এই সফলতা তুলে ধরে জানিয়েছে, আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী গত ১০ সেপ্টেম্বর সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইতোমধ্যে পার হয়েছে তার কার্যকালের একশ দিন। এই সময়ের মধ্যে মহানগরীর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যানজট ব্যবস্থাপনা ও পুলিশি সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লখ করা হয়, দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশ কমিশনার ঘোষণা দেন, সিলেটকে দেশের সবচেয়ে নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও আধুনিক স্মার্ট নগরীতে রূপান্তর করাই তার লক্ষ্য। একটি অপরাধমুক্ত সিলেট নগরী প্রত্যয়ে অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায়, তার দিক-নির্দেশনায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মহানগর পুলিশ ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ৫ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার ৭১৭ টাকার অবৈধ চোরাচালান পণ্য আটক করে।
এই ময়ে অপারেশন ডেভিল হান্টের আওতায় ১৫২ জনকে, অনৈতিক কাজে জড়িত ৪৭ জনকে এবং ১১৯ জন চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী, চোর ও ডাকাতকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৮৮ অপহৃত ব্যক্তি, ৫৫০টি হারানো ও চোরাই মোবাইল ফোন, ৩৬৮৫ পিস ইয়াবা, ১৪৫৯ বোতল বিদেশী মদ, ৩৯৩ লিটার চোলাই মদ, ৯ কেজি ৪১৯ গ্রাম গাঁজা ও ৯৭ বোতল ফেনসিডিল। এছাড়া অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যে ৯টি হোটেল সিলগালা করা হয়েছে।
এই একশ দিনে ১৬ রাউন্ড শর্টগানের লিডবল, ১০ রাউন্ড রাবার কার্তুজ এবং পুলিশের লুণ্ঠিত ২টি অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ কমিশনারের একশ দিনে বিকাশ প্রতারণার ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা উদ্ধার এবং মাদক ও চোরাচালানের অপরাধে মোট ১৮০টি মামলা রুজু হয়। গ্রেফতার করা হয় বিভিন্ন অপরাধে ২ হাজারের অধিক ব্যক্তিকে। এছাড়াও ট্রাফিক বিভাগ ৬ হাজার ১৩৩টি যানবাহন আটক, ৩ হাজার ৭৫৫টি মামলা দায়ের ও ১ কোটি ৬৮ লাখ ১১ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা আদায় করে।
মাঠ পর্যায়ে পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই পুলিশ কমিশনার সিলেটে কর্মরত সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ইমাম, হোটেল মালিক, ট্রাভেল এজেন্ট, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, বাজার কমিটির প্রতিনিধি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষের সাথে ধারাবাহিক মতবিনিময় করেন।
এসব মতবিনিময় সভায় উঠে আসা সমস্যা ও প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, যার অধিকাংশই ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। নগরবাসীর পুলিশি সেবা সহজ ও দ্রুত করতে পুলিশ কমিশনারের উদ্যোগে প্রযুক্তিনির্ভর অ্যাপ ‘জিনিয়া’ (GenieA) চালু করা হয়। এই অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা দ্রুত জরুরি পুলিশি সহায়তা ও অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য দিতে পারবেন। পর্যায়ক্রমে এতে যুক্ত করা হচ্ছে অনলাইন জিডি ও মামলা, সিসিটিভি ও এআই বিশ্লেষণ, ড্রোন নজরদারি ও অন্যান্য আধুনিক সেবা। এসএমপির সকল থানায় ‘জিনিয়া’ অ্যাপ চালু ও হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে পুলিশি সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ব্যাটারি চালিত রিকশা বিরোধী অভিযানে মহানগর এলাকা এখন প্রায় ব্যাটারি চালিত রিকশা মুক্ত। ফুটপাত দখলমুক্ত করে উন্মুক্ত করা হয়েছে নগরবাসীর চলাচলের জন্য। রাস্তা দখল করে বসানো দোকান সরিয়ে নির্ধারিত স্থানে বসার জন্য বলা হয়েছে।
ট্রাফিক সমস্যা নিরসনে সড়কে অবৈধ যানবাহন ও অবৈধ স্ট্যান্ডের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। রেজিস্ট্রেশনবিহীন যান, অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা, রুট পারমিটবিহীন গাড়ি ও যত্রতত্র পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিএনজি অটোরিকশা ও প্যাডেল রিকশার ভাড়া যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ এবং নির্ধারিত সময় ছাড়া ভারী যানবাহন নগরীতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় কমেছে যানজট ও দুর্ঘটনা। পার্কিংয়ের জন্য জায়গা ও স্ট্যান্ডে গাড়ির সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পাশাপাশি মানবিক উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপরাধমুক্ত রাখতে পুলিশ কমিশনারের নির্দেশনায় সিলেট মহানগরীর ১১৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ‘সচেতনতা ও সামাজিকীকরণ’ কর্মসূচি চালু করা হয়। এতে মাদক, ইভটিজিং, অনলাইন জুয়া, বাল্যবিয়ে, ট্রাফিক আইন ও পরিবেশ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সাথে পর্যটননগরী সিলেটে অতিথিদের নিরাপত্তায় আবাসিক হোটেল ও ট্রাভেল এজেন্সিতে নজরদারি জোরদার, কাগজপত্র যাচাই এবং মানবপাচার ও প্রতারণাসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৯টা ৩০ মিনিটের পর খাবার হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ঔষধের ফার্মেসি ছাড়া সকল দোকানপাট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এছাড়াও গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পুলিশ কমিশনার সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন মসজিদে জুম্মার নামাজে উপস্থিত হয়ে মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা, আইন মেনে চলা ও অপরাধ প্রতিরোধে জনসম্পৃক্ততার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
একই সঙ্গে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর ‘জিনিয়া’ অ্যাপের ব্যবহার ও সুবিধা সম্পর্কে ধারণা দেন।
পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম দায়িত্ব গ্রহণের পর গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এর সুফল নগরবাসী ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছেন।