তখন মাত্র ৪ বছর বয়স। নিজের নামটুকুও ঠিকমতো বলতে পারতো না ছোট্ট মেয়েটি। সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে একদিন তাকে অসহায় অবস্থায় পাওয়া যায়। কোথা থেকে এসেছে, কি পরিচয়—কেউ জানতো না। অন্যদিকে শিশুটির চোখে ছিল ভয়, অনিশ্চয়তা আর অজানা ভবিষ্যতের আতঙ্ক। তবে একদিন তার ঠাঁই হয় সমাজসেবা অধিদপ্তরে। এর মধ্য দিয়ে তার নতুন জীবনের সূচনা হয়।
সেই ছোট্ট শিশুটির নাম স্বপ্না আক্তার। দীর্ঘ ১৪ বছরের পথচলার পর বুধবার (১৩ মে/৩০ বৈশাখ) দুপুরে সিলেট মহানগরীর শিবগঞ্জ লামাপাড়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে বিয়ের পিঁড়িতে বসলো সে। যে প্রতিষ্ঠান একদিন তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, তাই হয়ে উঠলো তার নতুন জীবনের সূচনার সাক্ষী।
বিয়ের পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল আবেগ, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের অনন্য উদাহরণ। কোথাও কোনো ঘাটতি ছিল না। সাজসজ্জা, অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা—সবকিছুই ছিল আর দশটি বিয়ের মতো। উপস্থিত অনেকের চোখ হয়ে উঠেছিল অশ্রুজল। পরিবার-পরিচয়হীন এক মেয়েকে ঘিরে এত মানুষের ভালোবাসা সত্যিই বিরল দৃশ্য।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, স্বপ্না আক্তারকে উদ্ধার করার পর তাকে আশ্রয় দেওয়া হয় সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। ফলে তাকে আর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখানেই শুরু হয় তার বেড়ে ওঠা। তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। ধীরে ধীরে লেখাপড়া শিখে ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হয়।
বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস এম মোক্তার হোসেন জানান, “স্বপ্নার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে; কিন্তু কোনো অভিভাবক না থাকায় এবং তার সম্মতি নিয়েই আমরা বিয়ের আয়োজন করেছি। আমরা চেয়েছি, তার ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ ও সুন্দর হয়।”
পাত্রও সিলেটেরই সন্তান। তিনি বিদ্যুতের ঠিকাদারি কাজ করেন।
বিয়ের আয়োজনকে ঘিরে এগিয়ে আসেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশিষ্ট ব্যক্তি ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যা স্বপ্নার নামে এফডিআর করে রাখা হবে। স্থানীয় এক ব্যক্তি উপহার দিয়েছেন প্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র। পুনর্বাসন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়। একটি মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উপহার হিসেবে দেয় ১০০ কাপ দই।
সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন ছিল আনন্দমুখর ও হৃদয়স্পর্শী। কেউ বুঝতেই পারেননি, এটি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এক তরুণীর বিয়ে। বরং মনে হচ্ছিল, আদর-সোহাগে বড় হওয়া কোনো মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় ও জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো আব্দুর রফিকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত হয়ে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “আমার খুবই ভালো লেগেছে। সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র শুধু একটি পিতৃমাতৃহীন শিশুকে আশ্রয়ই দেয়নি, তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে জীবন গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আজ তাকে বিয়ে দিয়ে তার ভবিষ্যতের ভিত্তিও তৈরি করে দিলো।”
তিনি নবদম্পতির সুখী ও সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা করেন।
উল্লেখ্য, ২০১২ সাল থেকে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত, পথশিশু, ঝুঁকিতে থাকা ও পিতৃহীন শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, ভরণপোষণ এবং পুনর্বাসন সেবা দিয়ে আসছে। স্বপ্না আক্তারের গল্প সেই মানবিক উদ্যোগেরই এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে গেলো। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি