জুড়ী থেকে সংবাদদাতা : মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় ‘রুম টু রিড’ এর উদ্যোগে ’জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি পোর্টফোলিও’ কার্যক্রমের ‘অর্জন, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ করণীয় : অভিজ্ঞতা বিনিময় ও পর্যালোচনা সভা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত ২৪ আগস্ট দুপুরে জুড়ী উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো ফজলে রাব্বানী চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আসমা সুলতানা নাসরিন।
সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল রুম টু রিডের কার্যক্রমের অর্জন, প্রভাব, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে মতবিনিময়। এতে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ফোকাল শিক্ষক, অভিভাবক, মেয়ে শিক্ষার্থী ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাগণ অংশগ্রহণ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে রুম টু রিড, মৌলভীবাজার অফিসের ম্যানেজার রতন চক্রবর্ত্তী রুম টু রিডের কার্যক্রমে বিভিন্ন অংশীজনের সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
রুম টু রিডের জেন্ডার ইক্যুয়ালিটি পোর্টফোলিও কার্যক্রমের বিগত ৫ বছরের অর্জন, কার্যক্রমের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ করণীয় উপস্থাপনা করেন প্রোগ্রাম অফিসার (জিইপি) চাঁদনী রায়।
এছাড়া মক্তদীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ইসহাক আলী রুম টু রিড কার্যক্রমের ফলে মেয়ে শিক্ষার্থীদের জীবনে আসা ইতিবাচক পরিবর্তনসমূহ তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, জীবন দক্ষতা শিক্ষা ও অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা ও বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি আরো বলেন, জিইপি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি নন-জিইপি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও জীবন দক্ষতা অধিবেশনের মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জবা রানী চাষা বলেন, রুম টু রিডের জীবন দক্ষতা শিক্ষা মেয়ে শিক্ষার্থীদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমেছে এবং তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরো সচেতন ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, রুম টু রিড প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের জন্য উপকরণ সহায়তা ও একাডেমিক সহায়তার ব্যবস্থা করে থাকে। এই সহায়তার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পরীক্ষার ফলাফল ও পাশের হার উন্নত হয়েছে।
জীবন দক্ষতা শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলার কৌশল শিখছে এবং নিজেদের সমস্যা ও অনুভূতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সক্ষমতা অর্জন করছে। পাশাপাশি, শিক্ষার্থীদের মধ্যে যৌন হয়রানি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুম টু রিডের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, সংস্থাটি তাদের বিভিন্ন কার্যক্রম অত্যন্ত সুন্দরভাবে পরিচালনা করছে।
তিনি ভবিষ্যতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ছেলে শিক্ষার্থীদের জন্যও এ ধরনের সুযোগ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জুড়ী উপজেলার সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার দক্ষতা ও পড়ার অভ্যাস গঠনে ২০২২ সাল থেকে সহায়তা করার জন্য রুম টু রিডকে ধন্যবাদ জানান।
জুড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ তার বক্তব্যে বলেন, রুম টু রিডের কার্যক্রমের ফলে শিশুদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার হার কমেছে এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, এ পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে তিনি রুম টু রিডের কার্যক্রমের প্রভাব উপলব্ধি করেছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, যেসব বিদ্যালয়ে এখনো রুম টু রিডের কার্যক্রম শুরু হয়নি, ভবিষ্যতে সেখানে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক যেকোনো প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে তিনি সার্বিক সহায়তার আশ্বাস দেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তার বক্তব্যে জীবন দক্ষতা শিক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণগুলো থেকে অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব অরোপ করেন।
তিনি পড়ার দক্ষতা ও পড়ার অভ্যাসের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেন এবং রুম টু রিড কর্তৃক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাভ্যাস কার্যক্রমের প্রশংসা করেন।
তিনি মানবিক মুল্যবোধ এবং নৈতিকতা বিষয়ও জীবন দক্ষতা সেশনে অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন।
জেলা প্রশাসক বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষার প্রেক্ষাপট এবং শিক্ষার্থীদের শেখার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাইরের জগত সম্পর্কে জানার এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও প্রতিদিনের পাঠের বিষয় বাস্তব জীবনের সাথে সম্পর্কিত করার সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি রুম টু রিডকে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আরও কাজ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন যেন, শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারবে এবং শিক্ষকরা তাদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করবেন।
পরে ফুটবল ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন দলগুলোর হাতে জেলা প্রশাসক ট্রফি তুলে দেন।
সমাপনী বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, রুম টু রিডের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও শিখন পর্ব থেকে শিক্ষকেরা যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তা যেন অন্য শিক্ষকদের সঙ্গেও ভাগাভাগি করেন।
তিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে আরো ভালো ফলাফল এবং সার্বিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।