আল আজাদ
পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত বাংলাদেশ। একদিকে অনাবিল আনন্দ অন্যদিকে বুকে কষ্টের পাথর চাপা। কারণ স্বাধীন স্বদেশে স্বাধীনতার মহানায়ক অনুপস্থিত। শহীদুল ইসলামের লেখা আর অজিত রায় ও সহশিল্পীদের কণ্ঠে ধ্বনিত বিজয়ের প্রথম গানে সেই দুঃখবোধের প্রকাশ ঘটে এমনি করে, ‘পাশে নেই আমাদের মহান নেতা-খুশির মাঝে তাই জাগে ব্যথা।’ এর মধ্য দিয়ে গোটা জাতির আবেগ-অনুভূতি ঝরে পড়ে।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বাহাত্তরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এই ছিল বাংলাদেশের বাস্তবচিত্র। বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন বা কেমন আছেন কারো জানা ছিলনা। তাই গভীর উদ্বেগ ও আতংকে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছিল সাড়ে সাতকোটি বাঙালি। কারণ পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে এই মহান নেতাকে হত্যার চক্রান্ত করছিল।
পাকিস্তানি শাসক চক্রের এই চক্রান্ত যাতে নস্যাৎ হয় সেজন্যে কত দোয়া-দরুদই না পড়েছেন বাংলাদেশের মানুষ। করেছেন পূজা-প্রার্থনা। গ্রামের একজন অতি সাধারণ নারী আমার নানী নছিবা খাতুন নফল নামাজ পড়েছিলেন, রোজা রেখেছিলেন এবং কোরান খতম করেছিলেন। রাজনীতি বুঝতেন না; কিন্তু বুঝতেন বঙ্গবন্ধু ছাড়া এ দেশে সুখ-শান্তি আসবেনা। প্রমাণিত হয়েছে, এই সত্যে বিন্দুমাত্র খাদ নেই।
পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকারদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া এক কিশোর। গ্রামে আছি। নিয়মিত বাংলাদেশ বেতার, আকাশবাণী ও বিবিসি’র খবর শুনি। কান সবসময় খাড়া থাকে মূলত: একটি খবরের আশায়। আর তা হলো বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার। যদ্দূর মনে পড়ে, ৮ জানুয়ারি-তবে সময় একেবারে মনে নেই, হঠাৎ কানে এলো সেই প্রত্যাশিত খবরটি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি বিমান পাকিস্তান ত্যাগ করেছে। তবে কোথায় যাচ্ছে তা বলা হলোনা। অতএব বেতার যন্ত্র থেকে কান সরানো সম্ভব হলোনা একটি বারের জন্যে। বারবার খবরটি প্রচারিত হচ্ছে। প্রতিবারই মনে হচ্ছে, এই যেন প্রথম শুনলাম। শোনার তৃপ্তি মেটেনা। সন্ধ্যার দিকে খবর শুনলাম, বঙ্গবন্ধু লন্ডন পৌঁছেছেন। কথা বলেছেন, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের সঙ্গে। বিবিসি রাতে হোটেল ক্যারিজনে বঙ্গবন্ধুর সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া ভাষণের কিছু অংশও প্রচার করেছিল।
১০ জানুয়ারি সকাল থেকেই কানের সঙ্গে বেতারযন্ত্র। দিল্লি থেকে আকাশবাণী সরাসরি অনুষ্ঠান প্রচার করছে। সম্প্রচার করছে বাংলাদেশ বেতার। বঙ্গবন্ধু দিল্লি পৌঁছলেন। পেলেন একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে পূর্ণ মর্যাদা। ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই মহান নেতাকে অভ্যর্থনা জানালেন।
প্রিয় স্বদেশের পবিত্র মাটি স্পর্শ করেন বঙ্গবন্ধু বেলা ১টার দিকে। যুক্তরাজ্য থেকে তাকে নিয়ে আসা রাজকীয় বিমান ‘কমেট’ ঢাকার আকাশে দেখা দেওয়ামাত্র তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের জনসমুদ্র উছলে উঠে। উল্লাসে ফেটে পড়ে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা। সেই উচ্ছ্বস বেতার তরঙ্গে এমনভাবে কানে এসে বাজছিল-মনে হচ্ছিল, চোখের সামনেই যেন সবকিছু ঘটছে।
আজো কানে বাজে, বঙ্গবন্ধু বিমানের দরজায় এসে দাঁড়াতেই ধারাভাষ্যকার অনেকটা চিৎকার দিয়ে উঠেছিল ‘ঐতো নেতা বলে।’ মনে হয়েছিল, তখন তিনি ধারাভাষ্যকার থেকে একজন সাধারণ বাঙালিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন। না হলে এমনভাবে চিৎকার করার কথা নয়।
তেজগাঁও বিমান বন্দর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। রাস্তার জনস্রোত পাড়ি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সেখানে পৌঁছতে হয়েছিল প্রায় ৩ ঘণ্টায়। তখন তো আর টেলিভিশন দেখার সুযোগ ছিলনা; কিন্তু আবেগজড়িত বেতারের ধারাভাষ্য সেই অভাবটা পূরণ করে দিয়েছিল।