হাবিবুর রহমান হাবিব : প্রকৃতির বৈরী আচরণ আর মনুষ্যসৃষ্ট অব্যবস্থাপনার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ধ্বংসের মুখে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান ফসল বোরো ধান। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলা করতে ও প্রান্তিক কৃষকদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জলমহালের ইজারা প্রথা বাতিল করে তা উন্মুক্ত করাসহ দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান পরিস্থিতি ও সংকটের স্বরূপ: চলতি মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও অকাল বন্যায় জেলায় হাজার হাজার হেক্টর জমির কাঁচা ও আধাপাকা ধান এখন পানির নিচে। শিলাবৃষ্টির তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও শত শত হেক্টর জমির ফসল।
মূলত: নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস পাওয়া এবং হাওরের পানি চলাচলের পথে অপরিকল্পিত বাঁধ ও সড়ক নির্মাণের ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। প্রতি বছর ফসলরক্ষা বাঁধে বিপুল অর্থ বরাদ্দ হলেও নদী-নালা ও খাল-বিল খনন না করায় সুফল মিলছে না।
হাওরপাড়ে এখন শুধু হাহাকার। ধান শুকানোর জায়গা নেই। গবাদি পশুর খাদ্যেরও তীব্র সংকট। যাদের একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে, সেই সব সর্বস্বান্ত কৃষকের পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষক এখন দিশেহারা ও চরমভাবে অসহায়। এই সংকট উত্তরণে সরকারকে অবিলম্বে কিছু কার্যকরী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
জলমহাল উন্মুক্তকরণ: ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জীবনধারণের তাগিদে ‘ভাসান পানিতে’ মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সমস্ত ইজারা বাতিল করে জলমহালগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
সরাসরি ধান ক্রয়: মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করতে হবে, যাতে তারা ন্যায্যমূল্য পায়।
আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা: ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে মাসিক খাদ্য সহায়তা (ভিজিএফ) ও পর্যাপ্ত নগদ অর্থ প্রদান করা জরুরি।
ঋণ মওকুফ: কৃষকদের ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত, ঋণের সুদ মওকুফ এবং বিশেষ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ঋণ মওকুফের ঘোষণা দিতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি: আগামী মৌসুমে চাষাবাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে মানসম্মত বীজ, সার ও সুদমুক্ত কৃষি ঋণ নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার: দেশের মোট খাদ্য চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ জোগান দেয় এই হাওর অঞ্চল। তাই হাওরকে অবহেলা করার অর্থ হলো জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। কেবল অস্থায়ী বাঁধ সংস্কার নয়, বরং নদী খনন ও টেকসই বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার মাধ্যমে হাওরের কৃষিকে রক্ষা করা এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এটাই হাওরবাসীর প্রত্যাশা।