আল-আজাদ : ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা-কারো দানে পাওয়া নয়’। আসলেই তাই। তবে এ বাংলা কেবল মাতৃভাষা বাংলা নয়-স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশও। এই স্বাধীনতার জন্যে ত্রিশলাখ বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ইজ্জত হারাতে হয় দু’লাখ মা-বোনকে। অগণিত মানুষকে হারাতে হয়েছে সয়-সম্পত্তি। এককোটি মানুষকে সব হারিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল প্রতিবেশী দেশ ভারতে। এমন নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই।
বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে বিক্ষিপ্তভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম এমনকি সশস্ত্র লড়াইও হয়েছে; কিন্তু সেই সব আন্দোলন-সংগ্রামে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্তরা খুব বেশি ছিলনা। এ কারণে সফলতা হয়নি। তবে স্বাধীনতার পথ তৈরি করে দেয়। এই পথ ধরেই জাতি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একাত্তরে পৌঁছে পাকিস্তানি শাসন-শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করতে সক্ষম হয়।
বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বের সূচনা কৈশোরেই। ঐ বয়সেই তার মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী পরিলক্ষিত হতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তাকে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়; কিন্তু দেশ ভাগের পর তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে, যে আশ্বাসে বিশ্বাস রেখে এ অঞ্চলের মানুষ পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল সেই আশ্বাস ছিল মুখের-বুকের নয়। তাই যুবক শেখ মুজিব তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে থাকেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, কি স্বপ্ন ছিল তার। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তিনি রাজনীতিতে হাতেখড়ি নেওয়ার পর থেকে বাঙালি জাতির জন্যে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
সর্বশেষ যে তথ্যটি সামনে এসেছে তাতে দেখা যায়, ১৯৫১ সালেই শেখ মুজিব বাংলাদেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা করতে থাকেন।
আমরা জানি, ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন ছিল আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জনসংশ্লিষ্ট প্রথম স্ফূরণ। এ আন্দোলনেই প্রথম ছাত্র সমাজের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা ঘটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ভাষা আন্দোলনে ছিলেন প্রথম সারির অত্যন্ত সক্রিয় নেতা। এ জন্যে তাকে কারাবরণও করতে হয়।
পরবর্তী সময়ে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাঙালির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, শিক্ষা আন্দোলন ও আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন পুরোভাগে। এখানেই শেষ নয়, ১৯৬৬ সালে তিনি ঘোষণা করেন ‘বাঙালির মুক্তিসনদ ঐতিহাসিক ছয়দফা’। এই ‘ছয়দফা’ বাঙালির চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ‘ছয়দফা’ দাবি উত্থাপন করেন শেখ মুজিবুর রহমান। খবরটি পেয়েই কান খাড়া হয়ে যায় পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর। অনেক রাজনৈতিক দলও আঁতকে উঠে। এমনকি কেউ কেউ ছয়দফাকে সিআইএর চক্রান্ত আর ভারতের ষড়যন্ত্র বলে কটুক্তি করতেও তখন দ্বিধাবোধ করেননি, যদিও পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয়েছিল, বাঙালির নিজস্ব আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্র এই ‘ছয়দফা’তেই নিহিত ছিল। তাই বাঙালিরা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরু দায়িত্ব নিঃসঙ্কোচে তুলে দেয়।
১৯৬৬ সালের পয়লা মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর ঠিক ৫ বছর পরের পয়লা মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির দৃপ্তপায়ে পথচলা শুরু হয় চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে। সেই লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্থাৎ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়। অতঃপর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় স্বদেশে ফেরা। তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার নতুন সংগ্রামের সূচনা। এই সংগ্রাম এখন তারই কন্যার নেতৃত্বে সফল হতে চলেছে।