সিলেটে ঐতিহাসিক রেজিস্টারি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় জনসভা

প্রকাশিত March 24, 2022
সিলেটে ঐতিহাসিক রেজিস্টারি মাঠে অনুষ্ঠিত হয় তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় জনসভা

আল আজাদ : ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন। কারণ ১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানি শাসকচক্রের লেলিয়ে দেওয়া সেনাবাহিনী স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত-উজ্জীবিত বাঙালির উপর রাতের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচনা করে।
বাঙালির সব দাবি তখন এক দবিতে পরিণত হয়ে গেছে। লক্ষ্য একটাই-স্বাধীনতা। জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে ফেলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ১ মার্চ থেকে তার নেতৃত্বে চলছে অসহযোগ আন্দোলন। তিনিই তখন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। বাংলাদেশের মানুষ তাকে এ আসন অধিষ্ঠিত করেছে।
অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার সারাদিন ধরে চলে জনতার বিক্ষোভ। রাজপথ জুড়ে সর্বস্তরের সংগ্রামী মানুষের ঢল। তাদের চোখে-মুখে বজ্রের দৃঢ়তা। কণ্ঠে স্বাধীনতার প্রত্যয়দৃঢ় বজ্রনিনাদ। যেন সমুদ্রের উন্মত্ততা নিয়ে ফেটে পড়তে চাইছে।
বিকেলে পল্টন ময়দানে পূর্ব বাংলা শ্রমিক ফেডারেশন ও বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তারা মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠকের ফলাফলের অপেক্ষা না করে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশকে স্বাধীন করার ও স্বাধীন দেশে সমাজতন্ত্র অভিমুখীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আহবান জানান। তারা মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেন। ফলে জনমনে আতঙ্কের ছাপ দেখা দেয়। সবার মনে প্রশ্ন-কি ঘটতে যাচ্ছে। কি ঘোষণা করবে ইয়াহিয়া খান?
ঐদিন সকাল থেকেই সিলেটের রাজপথে লাঠি হাতে মিছিলের ঢল নামে। স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত ছাত্র-জনতার বজ্রধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হতে থাকে।
বিকেলে সদর মহকুমা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে রেজিস্টারি মাঠে তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ডা এম এ মালিক। বক্তব্য রাখেন, দেওয়ান ফরিদ গাজী, কাজী সিরাজ উদ্দিন, শাহ মোদাব্বির আলী, সিরাজ উদ্দিন আহমদ, জমির উদ্দিন, মহম্মদ আশরাফ আলী, ইনামুল হক চৌধুরী, বাবরুল হোসেন বাবুল, মকসুদ ইবনে আজিজ লামা, জিয়া উদ্দিন লালা প্রমুখ।
সুনামগঞ্জে সাংবাদিক-রাজনীতিক মুহাম্মদ আব্দুল হাই স্থানীয় লেখক সমিতির পক্ষে ‘জনমত’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। এতে প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত।’
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।
এ অবস্থায় রাত ৮টার দিকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা থেকে বিমান যোগে পালিয়ে ইসলামাবাদ চলে যান। পালিয়ে যান নাটের গুরু জুলফিকার আলী ভুট্টোও। তবে থেকে যায় সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত সেনা বাহিনী আর টিক্কা খান সহ পশ্চিমা নরপশুরা। মধ্যরাত থেকে এই হায়নার দল তাদের রাক্ষুসে ক্ষুধা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত নিরস্ত্র বাঙালির উপর। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার তাজা রক্তে সিক্ত হয় পিচঢালা কালো রাজপথ। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায় ‘সাকিনা বিবির কপাল ভাঙল, / সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর। / …শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাংক এল / দানবের মতো চিৎকার করতে করতে / ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হল। রিকয়েললেস রাইফেল / আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র।’ রক্তগঙ্গা বয়ে গেলো বাংলাদেশের বুক চিরে; কিন্তু উত্তাল বঙ্গোপসাগর সেই রক্তস্রোত থেকে জন্ম নিলো সাড়ে সাতকোটি মুক্তিযোদ্ধার। প্রধান অস্ত্র ‘অকৃত্রিম দেশপ্রেম’ যার কাছে অন্য যেকোন মারণাস্ত্র তুচ্ছ। বঙ্গবন্ধুই এ অস্ত্রবুকে পুরো জাতিকে রণসজ্জায় সজ্জিত করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে দেওয়া আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণাটি দেশময় প্রচারিত হয়ে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। শুরু হলো বীর বাঙালির মুক্তির যুদ্ধ। নয় মাসের অতুলনীয় এই রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধই বিশ্ব মানচিত্রে গর্ব আর গৌরবের সঙ্গে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্থান র্নিধারণ করে দেয়।