হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলা ৭ নম্বর করগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, নবীগঞ্জ জে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, খ্যাতিমান চিকিৎসক ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ডা কুটিশ্বর দাশ (কুটিশ্বর বাবু) ১৯২৪ সালের ১ জানুয়ারি অবিভক্ত ভারতের আসাম প্রদেশের সিলেট জেলার নবীগঞ্জ থানার মুক্তাহার গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন।
তার পিতা বিশিষ্ট সমাজসেবক ভগবান দাশ ও মাতা সুরধনী দাশ। সেই সময়ে ‘বাবুরবাড়ি’ নামে খ্যাত তাদের পরিবারটি ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, যশ ও খ্যাতিতে এই অঞ্চলের বিখ্যাত পরিবারগুলির মধ্যে অন্যতম। তিনি নবীগঞ্জ দরবার পাঠশালা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ভর্তি হন নবীগঞ্জ জে কে উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৪৩ সালে কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রাস ও হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজ থেকে ১৯৪৫ সাালে আইএ পাশ করেন।
জীবনাচারে তিনি ছিলেন অনন্য ভদ্র, সজ্জন, সংস্কৃতমনা ও অহিংসবাদী। সততা, পরোপকারিতা, দেশপ্রেম, বিচারবুদ্ধি ও মানবতাবোধ ছিল তার চারিত্রিক গুণাবলী। ব্যক্তিত্বের বিশালতা, জ্ঞানের গভীরতা, মার্জিত ব্যবহার ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমৃদ্ধ ব্যক্তি হিসেবে সবাই তাকে শ্রদ্ধা করতো। জীবদ্দশায়ই তিনি ব্যক্তি থেকে পরিণত হয়েছিলেন ব্যক্তিত্বে, হয়ে উঠেছিলেন প্রতিষ্ঠান। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে সরকারি-বেসরকারি চাকরির জন্য কোথাও ঢু না মেরে পৈত্রিক বিষয় সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি সমাজকে সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত করার প্রয়াসে পারিবারিক আর্থিক প্রাচুর্যতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য থাকা সত্ত্বেও বৈষয়িক উন্নতির সাধনের পথকে পদদলিত করে ১৯৫১ সালে শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। যোগদান করেন নবীগঞ্জ জে কে উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে। শিক্ষকতায় প্রবেশ করেই তিনি মেধা ও প্রজ্ঞা দ্বারা শিক্ষাঙ্গনের সকলের প্রিয় মুখ হয়ে উঠেন। অর্জন করেন ছাত্র-অভিভাবকের শ্রদ্ধা। অনেক গরিব ও মেধাবী ছাত্রকে নিজস্ব অর্থায়নে লেখাপড়া করিয়েছেন, যারা পরবর্তী সময়ে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
এক সময় তিনি সমাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত হয়ে ১৯৫৪ সালে শিক্ষকতা থেকে অকালীন অবসর গ্রহণ করেন। ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে তিনি কথার মূল্য বা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলতেন। আর এসব ছোট-বড় কাজের মধ্য দিয়েও সমাজ সচেতনতা ও স্বদেশ প্রীতির পরিচয় দিয়েছেন।
১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে তিনি যুক্তফ্রন্টের পক্ষে তৃণমূলে ব্যাপক কাজ করেন। ১৯৬০ সালে আইয়ূব খান মৌলিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘বেসিক ডেমোক্র্যাসি-বিডি’ নির্বাচন চালু করলে তিনি ১৯৬০ সালে বিডি মেম্বার ও ১৯৬৭ সালে তৎকালীন নবীগঞ্জ থানার ৬ নম্বর করগাঁও (বর্তমানে ৭ নম্বর) ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ইউনিয়ন কাউন্সিলের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে অত্যন্ত সুনাম ও শ্রদ্ধার সাথে চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন জননেতা কুটিশ্বর দাশ।
১৯৬৯ সালে পূর্ব-বাংলা স্বাধিকারের চেতনায় জ্বলে ওঠে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন এবং এক সময় পরিবার পরিজনের নিরাপত্তার প্রয়োজনে এলাকার মুরুব্বিদের পরামর্শে সীমান্তে ওপারে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন। শরণার্থীদের খাদ্য ও ঔষধসহ প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদা পূরণে শুরু করেন রিলিফ কার্যক্রম। শরণার্থীদের সমস্যাবলী সমাধানের পাশাপাশি যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে তাদের রিক্রুট করেন মুক্তিযুদ্ধে। তাছাড়া তিনি মুক্তিযোদ্ধাদেরও নানাভাবে সহযোগিতা করেন।
দেশ স্বাধীন হলে দেশে ফিরেই স্ব-গ্রামসহ ইউনিয়নের রাজাকার ও দুর্বৃত্তদের কর্তৃক লুটকৃত মালামাল ফেরত আনা ও পরিস্থিতি শান্ত রাখতে ভূমিকা রাখেন। যুদ্ধবিধস্ত গ্রামবাংলা পুনর্গঠনে ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর-বাড়ি নির্মাণে সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি নিজের থেকেও সহযোগিতা করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামবাংলা পুনর্গঠন করতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ান।
হোমিও চিকিৎসক হিসেবেও তিনি ছিলেন কিংবদন্তি তুল্য। আজীবন এলাকাবাসীকে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মুল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে গেছেন। তিনি ছিলেন একজন লেখক, কবি ও গীতিকার। অনেক পদাবলী ও লোকগীতি রচনা করে নিজেই সুরারোপ করেন।
১৯৯৫ সালের ৪ এপ্রিল (বাংলা বর্ষ ১৪০১ সালের ২০ চৈত্র) মঙ্গলবার ভোরবেলা ইহলোকের ছেড়ে পরলোকে গমন করেন মহৎ ও প্রজ্ঞাবান এই ব্যক্তিত্ব। তার স্মরণে নবীগঞ্জের সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মীরা ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর গঠন করেন ‘কুটিশ্বর দাশ স্মৃতি সাহিত্য পরিষদ’। ২০১৫ সালে তার ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এই সংগঠন থেকে কুটিশ্বর দাশ স্মারকগ্রন্থ ‘স্মরণাঞ্জলি’ প্রকাশিত হয়। আগামীতে স্মারকগ্রন্থের পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশের পরিকল্পনা করা হবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের সহসভাপতি প্রভাস চন্দ্র দাশ টিটু ও সাধারণ সম্পাদক সুকান্ত দাশ।