ভালোবাসার দায়ে ঘর হারানো ‘পাগলী’ ও ‘জন্মান্ধ’র সংসার জীবন

প্রকাশিত February 14, 2026
ভালোবাসার দায়ে ঘর হারানো ‘পাগলী’ ও ‘জন্মান্ধ’র সংসার জীবন

মিন্টু দেশোয়ারা : বাসমতিকে এলাকার মানুষ ‘পাগলী’ বলে ডাকে। তবু তিনি এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী (জন্মান্ধ) ব্যক্তির সাথে প্রেমে জড়িয়ে যান। তাই পরিবার তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। একইভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেও পাগল নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্কের কারণে একই পরিণতি বরণ করতে হয়।
অন্যদিকে তাদের কেউ কাজও দেয়না। তখন কোন উপায় না পেয়ে তারা গ্রামের পাশের বাজারে থাকতে শুরু করলেন ছাপরা বানিয়ে। সেখানে বাসমতি রবিদাস দিন শুরু করতেন ভোরবেলায় স্বামীকে সাহায্য করার মাধ্যমে। নাস্তা তৈরি থেকে শুরু করে তাকে স্নান করানো এবং পোশাক পরানো সবকিছুই তার দায়িত্ব। এরপর হাত ধরে ভিক্ষা করতে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানো।
গত ২৫ বছর ধরে চলছে ৪৫ বছর বয়সী বাসমতির দাম্পত্য জীবন। তার স্বামী রামনারায়ণ রবিদাস। তাদের গল্প কেবল শারীরিক অক্ষমতার সাথে লড়াই করার জন্য নয়-তাদের গল্প সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার দ্বারা পরীক্ষিত প্রেমের গল্প।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পালকিছড়া চা বাগানের রামনারায়ণ আগে একটি বিয়ে করেছিলেন; কিন্তু সেই স্ত্রী মারা যান সন্তান প্রসবের সময় প্রায় ৩০ বছর আগে। তখন থেকে তিনি ছন্নছাড়া হয়ে পড়েন। পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ তাকে আর গুরুত্ব দিতোনা।
একপর্যায়ে দেখা হয়ে যায় বাসমতি রবিদাসের সাথে। চা বাগানের রাস্তায় কথা হতো একজনের সাথে আরেকজনের। চা বাগানের সেকশনেই শুরু হয় তাদের ভালোবাসার গল্প। সেই থেকে প্রেম।
বাসমতি বলেন, “তার সাথে দেখা হলে মন ভরে কথা বলতাম; কিন্তু আমার পরিবারের কেউ তাকে সহ্য করতোনা। সবাই আমাকে পাগল বলতো। তার সাথে সম্পর্কটা কেউ মেনে নিতে পারেনি। একদিন আমাকে তারা ঘর থেকেই বের করে দিলো। আমিও উপায় না পেয়ে তার ঘরে আশ্রয় নেই; কিন্তু আমার স্বামীর বাবা আমাকে গ্রহণ করলেননা। আমার কারণে তাকেও বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। এরপর থেকেই আমরা একে অন্যের হাত ধরে রাস্তায় থাকতে শুরু করলাম। সারাদিন একসাথেই থাকতাম। ভিক্ষা করতাম। স্বামীর আত্মীয়-স্বজনরাতো আমাদেরকে দেখলে থুথু দিতো। অন্যদিকে আমার পরিবারের কথা, আমি অন্ধ ব্যক্তিকে বিয়ে করেছি বলে আমার বোনের সংসার টিকবেনা-এই অজুহাত দেখিয়ে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়।”
তিনি আরো জানালেন, “আমাদের নিজের জাতের মানুষজন আমাদের এতো অবমূল্যায়ন করতো যে, দেখে বড় কষ্ট লাগতো। প্রায় পাঁচ মাস বাজারের গাছের নিচে থাকলাম। ভিক্ষায় যে কাপড় চোপড় পেতাম তাই দিয়ে কোনমতে দিনকাল পার করতাম। পরে এক লোক দয়া করে তার বারান্দায় থাকতে দেয়। সেই সময় প্রতিদিন যেতো শুধু কান্নাকাটি করে। শুধু ভগবানকে বলতাম, এতো কষ্ট কেনো দিলে ভগবান তুমি।“
বাসমতি বলেন, “আমার স্বামী অন্ধ দেখতে পায় না ঠিকই; কিন্তু সে আমার সঙ্গ ছাড়েনি।”
রামনারায়ণ রবিদাস জানালেন, স্ত্রী মারা যাওয়ার পর কেউ তার খেয়াল করতো না। তখনই দেখা হয় বাসমতির সাথে। মন খুলে কথা বলতাম। তার সাথে সম্পর্কের কথা জানাজানি হলে বাবা জন্মের ভাগী হলেও কর্মের ভাগী আমি হতে পারবেননা বলে বাড়ি থেকে বের করে দেন।
তিনি বলেন, “বাসমতি যখন দেখা করতে আসতো তখন খুব অবাক হতাম। আস্তে আস্তে তার প্রতি আসক্ত হতে শুরু করলাম। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জন্মাতে শুরু করলো।”
রামনারায়ণের চোখ জলে ভরে ওঠে। বলতে থাকেন, “
তার কাঁধে হাত রেখেই আমাকে চলতে হয়, তার চোখেই আমার ভরসা।”
একবছর পূর্ণ না হতেই এক পুত্র সন্তান আসে ব্যতিক্রমী এই দম্পতির ঘরে; কিন্তু আনন্দের পাশাপাশি ভরন পোষণ নিয়ে চিন্তায় নির্ঘম রাত কাটতো তাদের। নিয়মিত খেতে না পাওয়ায় মায়ের বুকে দুধ হতোনা। মাঝে মধ্যে প্রতিবেশীরা দুধে এনে দিতেন। এ অবস্থায় প্রায় দিন সন্তান উপোস থাকতো।
এরপর আরেক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তখন সন্তানদের নিয়ে ভিক্ষায় বেরোলে শমসেরনগর বাজারের ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের তিন-চারজন মিলে খাবার কিনে দিতেন।
এভাবেই তাদের কঠিন জীবন-সংগ্রাম চলতে থাকে। আস্তে আস্তে জমতে থাকে কিছু অর্থ। এক পর্যায়ে সাহসে বুক বেঁধে জোগাড় করলেন এক লাখ টাকা ঋণ। কিনলেন একটি অটোরিকশা (বিদ্যুৎ চালিত)। ভেবেছিলেন, ছেলে সেটি চালাবে, দু’মুঠো ভাত নিশ্চিত হবে, ভিক্ষার জীবনের অবসান হবে; কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে গেলো। গত ৩১ ডিসেম্বর তাদের শেষ সম্বল অটোরিকশাটি চুরি হয়ে যায়।
উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় রামনারায়ণ রবিদাস জানালেন, “বড় অভাবে দিন চলে। ভিক্ষা করেই সংসার চলতো। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে অটোরিকশাটি কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবেনা। ছেলে চালাবে, সংসার চলবে; কিন্তু ভগবান আর সে সুখ দিলেন না।’
তার কণ্ঠ ভেঙে আসে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। আর কথা বলতে পারলেননা।
পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রবিদাস শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “এই অটোরিকশাটাই আছিল বিপদের ভরসা। মনে করছিলাম, আর ভিক্ষা করবোনা। সংসারটা একটু দাঁড়াইবো। সব শেষ হয়ে গেলো। চোরে মরা মানুষরে মাইরা গেলো।”
সুমন যাদব নামে এক প্রতিবেশী বললেন, “এতো অভাব, অপমান, দুঃখ, কষ্ট, লাঞ্চনা তবু শুধু ভালোবাসার জন্য একটি সংসার টিকে আছে ২৫ বছরের উপরে। একজন স্ত্রীর ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ব কতটা শক্তিশালী হতে পারে তা বিশ্বাস করা কঠিন, যদি না আপনি বাসমতিকে দেখেন।”