আল-আজাদ : পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী একাত্তরের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে খাদিম নগরের অস্থায়ী সামরিক ছাউনি পল্লী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে সিলেট শহরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একসাথে প্রচণ্ড শব্দে গর্জে উঠে অসংখ্য আধুনিক মারণাস্ত্র। পাশবিক উন্মত্ততায় রাতের নীরবতা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। সকল টেলিফোন সংযোগ বিচিছন্ন করে দেয়া হয়। পাড়া-মহলায় তীব্র আতংক ছড়িয়ে পড়ে।
ইতোমধ্যে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়েন। প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত টগবগে যুবকরা অবরোধ গড়ে তুলতে আরম্ভ করেন শহরের প্রধান প্রধান রাস্তায়। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে মুহুর্মুহু স্লাগান চলতে থাকে। সবার মনে বজ্র শপথ, প্রাণ যায় যাক-তবু পশ্চিমা হায়নার দলকে রুখতে হবে।
পাকিস্তানি জল্লাদরা প্রথমেই সিলেট শহরের মিরাবাজার-জতরপুর এলাকায় একদল দুঃসাহসী যুবকের অবরোধের মুখোমুখি হয়। অমনি হত্যার নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠে গুলি ছুঁড়ে এলোপাতাড়ি। সাথে সাথে আব্দুস সামাদ ফকির নামের বামপন্থী রাজনীতির সমর্থক এক দামাল ছেলের বক্ষ বিদীর্ণ হয়। রাজপথে বয়ে যায় রক্তের স্রোত। এর মধ্য দিয়ে প্রিয় স্বদেশকে ভালবেসে আত্মদানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং গৌরবোজ্জ্বল আত্মদানের কাছাকাছি সময়ে দেশ ত্যাগের উদ্দেশ্যে সীমান্তের দিকে যাবার পথে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র অন্যতম আসামি মেজর (অব) এম এ মুত্তালিব টিলাগড় চৌমুহনায় দু’জন শত্রুকে হত্যা করেন। সিলেট শহরে এই প্রথম পশ্চিমাদের রক্ত ঝরে। তবে বড় ধরনের প্রতিরোধ যুদ্ধটি আরো কয়েকদিন পরে সংঘটিত হয়।
পাকিস্তানি হানাদার সেনারা ২৬শে মার্চ ভোর ৫টা থেকে শহরে সান্ধ্য আইন জারি করে, যা ২৮শে মার্চ পর্যন্ত বলবৎ থাকে।
এসব ঘটনার আগে ২৫শে মার্চ বিকেলে পুলিশের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ সদস্য দেওয়ান ফরিদ গাজীর নিকট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি তারবার্তা আসে; কিন্তু তৎকালীন পুলিশ সুপার আব্দুল কুদ্দুছ সেটি লুকিয়ে রাখেন। অবশ্য দেশপ্রেমিক একজন সিপাহীর মাধ্যমে তা এক সময় প্রাপকের কাছে পৌঁছে যায়।
এভাবেই সিলেটে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।