এ এইচ এম বজলুর রহমান : বাংলাদেশ যখন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন একটি উদীয়মান ও জরুরি চ্যালেঞ্জ ক্রমেই সামনে আসছে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর বিভ্রান্তিমূলক ব্যবহার এবং ভুয়া তথ্যের (Disinformation) লাগামহীন বিস্তার। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এসব প্রযুক্তি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে; কিন্তু এর অন্ধকার দিক আস্থা দুর্বল করে, নির্বাচনী বিতর্ক বিকৃত করে এবং সমাজকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করে।
উৎসাহজনক যে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) আগেভাগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-(এআই/AI) দ্বারা সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি যথার্থভাবেই বলেছেন যে, ‘এআই’ প্রচলিত অস্ত্রের চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এটি বিভ্রান্তিকর তথ্য ও ভুয়া খবর দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।
এএমএম নাসির উদ্দিন উল্লেখ করেছেন: “এখন আমার ছবি ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে কনটেন্ট প্রচার করা সম্ভব, যা ‘এআই’র অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তিনি একে “আধুনিক হুমকি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, যা নির্বাচনী প্রচারণা ব্যাহত করতে পারে এবং ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
এছাড়াও সিইসি আরও গুরুত্বপূর্ণ কিছু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছেন—অবৈধ অস্ত্রের ঝুঁকি, ভোট প্রক্রিয়ায় জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং শক্তিশালী ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা। নির্বাচনী ব্যবস্থার সুষ্ঠুতা শক্তিশালী করতে এই বিষয়গুলোতে যৌথভাবে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
১৩ কোটিরও বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, কোটি কোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই চ্যালেঞ্জগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ‘এআই’ চালিত কৌশল ও ব্যাপক ভ্রান্ত তথ্য প্রচারণার সংযোগ এবারের নির্বাচনে এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের ডিজিটাল চিত্র
(DataReportal) অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যবহারের কিছু প্রধান দিক হলো:
বাংলাদেশে সক্রিয় মোবাইল সংযোগ সংখ্যা ১৮৫ মিলিয়ন, যা মোট জনসংখ্যার ১০৬ শতাংশ। তবে এর মধ্যে কিছু সংযোগ কেবল ভয়েস ও এসএমএস সেবা পর্যন্ত সীমিত থাকতে পারে এবং সবগুলো ইন্টারনেট সুবিধাসম্পন্ন নয়।
২০২৫ সালের শুরুতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৭.৭ মিলিয়ন, যা মোট জনসংখ্যার ৪৪.৫ শতাংশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬ কোটি (জনসংখ্যার ৩৪.৩ শতাংশ)।
এই পরিসংখ্যান সামগ্রিক একটি চিত্র দিলেও, ডিজিটাল প্রবণতা কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে তা বুঝতে হলে আরও গভীরে অনুসন্ধান প্রয়োজন।
২০২৫ সালে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে এক প্রাণবন্ত চিত্র। ৪৫ মিলিয়নেরও বেশি সক্রিয় ব্যবহারকারী নিয়ে ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও লিংকডইন মানুষের সংযোগ, যোগাযোগ ও ব্যবসার ধরন পাল্টে দিচ্ছে।
সাশ্রয়ী স্মার্টফোন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার বৃদ্ধি এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। বিনোদন, সামাজিক সম্পৃক্ততা, পেশাদার নেটওয়ার্কিং বা ডিজিটাল মার্কেটিং—সবক্ষেত্রেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বেড়ে চলেছে।
মূল পরিসংখ্যান (২০২৫): মোট ব্যবহারকারী: ৬ কোটি (৩৪.৩% জনসংখ্যা)
লিঙ্গভিত্তিক বণ্টন: নারী ৩৭%, পুরুষ ৬৩%
ফেসবুক: ৬ কোটি ব্যবহারকারী
টিকটক: ৪৬.৫ মিলিয়ন (১৮+ বয়সী)
ইনস্টাগ্রাম: ৭.৫ মিলিয়ন
লিংকডইন: ৯.৯ মিলিয়ন
এক্স (টুইটার): ১.৭৪ মিলিয়ন
নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে ‘এআই’র প্রভাব :
‘এআই’ এখন দৈনন্দিন বাস্তবতা। এর মাধ্যমে সুপার-রিয়ালিস্টিক ছবি, কণ্ঠস্বর নকল বা টেক্সট তৈরি করা সম্ভব। তবে নির্বাচনে এর ব্যবহার নতুন বিপদের দরজা খুলে দেয়।
ডিপফেক প্রযুক্তি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এতে রাজনৈতিক নেতাদের এমনভাবে উপস্থাপন করা যায় যেন তারা এমন কিছু বলেছেন বা করেছেন যা আসলে ঘটেনি। তীব্র রাজনৈতিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে এমন কনটেন্ট সহজেই ক্ষোভ উসকে দিতে পারে।
‘এআই’ চালিত বটও আরেকটি হুমকি। এগুলো ভুয়া পোস্ট, হ্যাশট্যাগ বা লাইক দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে মিথ্যা জনমতের ছবি তৈরি করে, যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করতে পারে।
বাংলাদেশের ভ্রান্ত তথ্যের বাস্তুতন্ত্র : বাংলাদেশে ভ্রান্ত তথ্য নতুন নয়। তবে ‘এআই’র গতি ও পরিসর বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে যা বানাতে ও ছড়াতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত, এখন তা মিনিটেই সম্ভব এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যায়।
ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল সাক্ষরতা কম থাকা গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বা প্রথমবারের ভোটাররা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে।
নির্বাচনী মৌসুম সবসময় গুজব ও প্রোপাগান্ডার জন্য উর্বর ভূমি। অতীতে প্রার্থীদের নিয়ে ভুয়া খবর বা মনগড়া কেলেঙ্কারি ছড়ানো হয়েছে। আজ ‘এআই’ দিয়ে এ ধরনের খবর আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তৈরি হচ্ছে। একটি ভুয়া ভিডিও—যদিও পরে খণ্ডন করা হয়—অল্প সময়েই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
বাস্তব জীবনে প্রভাব: বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই দেখেছে অনলাইন গুজব কিভাবে বাস্তব সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে এ ধরনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
‘এআই’ তৈরি ভুয়া অডিও ক্লিপ নির্বাচন জালিয়াতির ইঙ্গিত দিলে বা নেতার উসকানিমূলক বক্তব্য প্রচার করলে তা বিক্ষোভ, অস্থিরতা কিংবা টার্গেট হামলা ডেকে আনতে পারে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো আস্থার অবক্ষয়। যখন নাগরিকরা সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে পারে না, তখন তারা বৈধ সংবাদ ও সরকারি ফলাফলেও সন্দেহ করতে শুরু করে।
শাসন ঘাটতি: প্রযুক্তির অগ্রগতি আর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে এক বড় ফাঁক আছে। বর্তমান নির্বাচন আইন শারীরিক প্রচারণায় সীমিত; কিন্তু ডিজিটাল প্রচারণা কার্যত অনিয়ন্ত্রিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো বাংলায় কনটেন্ট মডারেট করতে ধীর ও অপ্রস্তুত। স্থানীয় প্রেক্ষাপট বোঝার অভাবও আছে। ফলে সরকার, সিএসও ও টেক কোম্পানির মধ্যে শক্তিশালী সহযোগিতা ছাড়া ক্ষতিকর কনটেন্ট ঠেকানো সম্ভব নয়।
ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয়:
০১. ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধিনা: গরিকদের অনলাইনে পাওয়া তথ্য যাচাই ও প্রশ্ন করার দক্ষতা বাড়াতে হবে।
০২. ফ্যাক্ট-চেকিং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ: স্থানীয় উদ্যোগ যেমন ‘বুম বাংলাদেশ’কে (BOOM Bangladesh) আরও শক্তিশালী করতে হবে।
০৩. ডিজিটাল আচরণবিধি প্রয়োগ: রাজনৈতিক দলগুলোকে এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াবে- না এমন প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
০৪. টেক প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা: ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটককে বাংলায় কনটেন্ট মডারেশন বাড়াতে হবে, ‘এআ্ই’ তৈরি কনটেন্ট লেবেল করতে হবে।
০৫. সিএসও পর্যবেক্ষক হিসেবে নাগরিক সমাজকে পর্যবেক্ষণ, প্রতিবেদন ও জনসচেতনতায় সক্রিয় হতে হবে।
সামনে পথচলা: বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষা নয়; এটি ডিজিটাল যুগে গণতন্ত্র রক্ষারও পরীক্ষা। ‘এআই’ ও ভ্রান্ত তথ্যের নেতিবাচক প্রভাব কেবল সম্ভাবনা নয়, বরং তাৎক্ষণিক ও বাস্তব যা গণতান্ত্রিক পছন্দ বিকৃত করতে এবং সামাজিক সম্প্রীতি ভাঙতে পারে।
যদি নিয়ন্ত্রণহীন থাকে, এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগত আস্থা নষ্ট করতে, সহিংসতা উসকে দিতে এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল করতে পারে। তবে দূরদৃষ্টি, সহযোগিতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে।
লাখো বাংলাদেশি যখন ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তারা যে তথ্য পাচ্ছে তার সঠিকতা ভোটের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘এআই’ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলা করা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়—এটি নির্বাচনের বৈধতা ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্ন।
এ এইচ এম বজলুর রহমান : ডিজিটাল গণতন্ত্র উন্নয়নে বিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন-বিএনএনআরসি, এবং বাংলাদেশে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রাষ্ট্রদূত, নীতি গবেষণা ফেলো, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে গণমাধ্যম, তথ্যের অখণ্ডতা ও সমাজ গঠনের ভবিষ্যৎ রূপায়ণে নিয়োজিত! ceo@bnnrc.net